
৪৬ হাওরে ১৫ই ডিসেম্বর থেকে বাঁধের কাজ শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু ২৪ দিন পার হলেও তা শুরু হয়নি। পানি উন্নয়ন বোর্ড এখনও নীরব। এ অবস্থায় ফসল হারানোর শঙ্কায় কৃষক। হাওর রক্ষাবাঁধের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা, মধ্যনগর, দিরাই, শাল্লাসহ বিভিন্ন উপজেলায় এখনো পিআইসি গঠন করেনি। এদিকে কৃষকরা হাওরের পানি শুকিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বোরো ধানের চারা রোপণ করা শুরু করেছে। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও সময়মতো বাঁধ নির্মাণ না করে নামমাত্র বাঁধ নির্মাণ করার জন্য পিআইসির মাধ্যমে পাউবো পুকুর চুরির করার পাঁয়তারা করছে। ফলে জেলার লাখ লাখ কৃষক আগাম বন্যায় কোটি কোটি টাকার ফসলহানির আশঙ্কায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে আছে। সরকার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, পিআইসি ও ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে দ্রুত জোরালো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেয়ায় সর্বস্তরের জনসাধারণের মাঝে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। জেলার উল্লেখযোগ্য বৃহৎ হাওরগুলো হলো খরচার হাওর, শনির হাওর, মাতিয়ান হাওর, লোভার হাওর, বলদার হাওর, টাঙ্গুয়ার হাওর, দেখার হাওর, চাপাতি হাওর, তুফান খালি, মাছুয়ারাখারা, সুরাইয়া বিবিয়ানা, জোয়াইরাসহ মোট ছোট-বড় ৪৬টি হাওর। সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি অফিস সূত্র জানাযায়, এ জেলার আবাদি জমির পরিমাণ ৩৭,৯২১৬ হেক্টর। তার মধ্যে প্রায় ১৯ হাজার হেক্টর জমিতে প্রতি বছরের ন্যায় এবারো বিভিন্ন প্রকার ধান চাষ করা হবে। আর বাকি জমিতে অন্যান্য ফসল। আর হাওরের বাঁধ রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ড এডিপি প্রকল্পের অধীনে জেলার ৪৬টি হাওরের ২৩০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ ও মাটি ভরাটের ১০ কোটি ৭০ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে। উৎপাদিত ধানের মধ্যে রয়েছে হাইব্রিড, স্থানীয় ও বাকি জমিতে অকশি জাতীয় ধান চাষ করা হয়েছে। এসব জমিতে প্রতি বছর উৎপাদিত ধান থেকে ৯ লাখ টন ফসল উৎপন্ন হয়। যার মূল্য ১৫শ’ কোটি টাকা। আরো জানা যায়, জেলায় ৪৬টি হাওরে ২৩০টি পিআইসি মাধ্যমে হাওর রক্ষার বাঁধ নির্মাণ, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ করার কথা রয়েছে জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের। জেলার ৩৭টি হাওর বড় ও অন্যান্য ছোট হাওরে উৎপাদিত এক ফসলি বোরো ধান জেলাবাসীর একমাত্র সম্পদ। জেলার ২৫ লক্ষাধিক জনসাধারণের মধ্যে প্রায় ২০ লক্ষাধিক মানুষ ওইসব হাওরে চাষাবাদের উপর নির্ভর করে তাদের জীবন-জীবিকা পরিচালিত করে থাকে।
সাদেক আলী, রফিকুল ইসলাম, উত্তম রায়, শফিকুলসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলার হাওর পাড়ের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানাযায়, হাওর রক্ষায় সরকার প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা দিলেও সঠিকভাবে, সময়মতো বাঁধ নির্মাণ ও মেরামত না হওয়ার কারণে কষ্টের ফলানো সোনার ফসল সামান্য পাহাড়ি ঢলের পানির চাপে বাঁধ ভেঙে পানিতে তলিয়ে যায়। তাছাড়া দুর্নীতির কারণে প্রতি বছরই ৪০ ভাগ কাজ হয় না। হাওরের পানি কমলেও ফসল রক্ষা বাঁধ মেরামতে এখনো কোনো প্রস্তুতি নেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের পিআইসিদের। আবারো পাহাড়ি ঢলের পানিতে হাওরগুলো ডুবে যাওয়ার আশঙ্কায় আতঙ্কের মাঝে আছি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বিভিন্ন সংগঠনের লোকজন জানান, বিভিন্ন হাওরে নির্মিত বেড়িবাঁধ কৃষকদের ফসল রক্ষার্থে কোনো উপকারে না আসলেও বাঁধ নির্মাণের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের পকেট ভারি হয়েছে আর পিআইসি মাধ্যমে প্রতি বছর দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছে পাউবো যা ওপেন সিক্রেট। তাহিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুস সালাম বলেন, হাওরের বেড়িবাঁধ নির্মাণে আমাদের পক্ষ থেকে বার বার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বলছি। সময়মতো সঠিকভাবে বাঁধ না হলে গত বছরের মতো এবছরও বাঁধ ভেঙে বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে। তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কামরুল জানান, প্রতি বছর পাউবো হাওরের বাঁধ নির্মাণ ও মেরামত করার নামে কোটি কোটি টাকা পুকুর চুরি করে। যার ফলে হাওরে পাউবোর বালির বাঁধ সামান্য পানির চাপে ভেঙে কৃষকের কষ্টের ফলানো সোনালি ফসল পানিতে তলিয়ে যায়। এবার হাওরের বাঁধ ভেঙ্গে ফসলের ক্ষতি হলে এর দায় পাউবো কেউ নিতে হবে কোনো ছাড় দেয়া হবে না। জনস্বার্থে এবার কঠিন আন্দোলন করা হবে।
এ ব্যাপারে সুনামগঞ্জ জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আফছার উদ্দিন জানান, হাওরে পানি কমতে দেরি ও সম্প্রতি জেলা পরিষদ নির্বাচনের কারণে পিআইসি গঠন ও কাজ শুরু করতে দেরি হয়েছে। যেসব এলাকায় পিআইসি গঠন করা হয়নি খুব শিগগির পিআইসি গঠন করে বাঁধের কাজ শুরু হবে। আমাদের বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১০ কোটি ৭০ লাখ টাকা এত কম টাকায় বাঁধ রক্ষার কাজ করতে আমরা হিমশিম খাচ্ছি।
উল্লেখ্য, গত বছর জেলার ছোট বড় ৪৬টি হাওরে সময়মতো ও সঠিকভাবে বাঁধ মেরামত না করায় ১৫টি বাঁধ ভেঙে ২৫টি হাওরের ৬০-৭০ ভাগ পাকা, আধাকাঁচা বোরো ধান পানিতে তলিয়ে যায়।