
সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জ থেকে পাথর তুলে বাংলাদেশের যেসব যায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সেগুলো উদ্ধার করে আগামী সাত দিনের মধ্যে ফেরত আনার নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।
একটি রিটের ওপর শুনানি করে বৃহস্পতিবার এই আদেশ দেওয়া হয়েছে।
হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ নামের একটি সংগঠনের পক্ষ থেকে এই রিট করা হয় বলে জানান আদালতে রিটের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেওয়া আইনজীবী মনজিল মোরসেদ।
তিনি জানান, বৃহস্পতিবার বিচারপতি কাজী জিনাত হক ও বিচারপতি আইনুন নাহার সিদ্দিকার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেয়।
সাদা পাথর ফেরত আনার পাশাপাশি এগুলো লুটকারীদের নাম-ঠিকানাসহ তালিকা দাখিলেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সাদ পাথর অপসারণ করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসনের নিস্ক্রিয়তা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না এবং এই এলাকাটিকে সংরক্ষণে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না এব্যাপারেও রুল জারি করেছে আদালত।
ভোলাগঞ্জের এই এলাকাটিকে কেন ‘ইকোলজিক্যাল ক্রিটিক্যাল এরিয়া’ ঘোষণা করা হবে না সেটাও বলা হয়েছে রুলে।
আরেকটি রুলে বলা হয়েছে, যারা ক্ষতি করেছে তাদের কাছ থেকে কেন ক্ষতিপূরণ আদায় করা হবে না। এর জবাব দেওয়ার জন্য চার সপ্তাহের সময় দেওয়া হয়েছে।
আদালত অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দিয়েছে চারটি।
পাথর ফেরত আনার বিষয়ে কতদূর কী করা হলো এ বিষয়ে আগামী বৃহস্পতিবার প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।
উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন একটি কমিটি করতে বলা হয়েছে যারা ভোলাগঞ্জে কী পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে তা নির্ণয় করবে এবং আদালতে প্রতিবেদন আকারে দাখিল করবে।
৪৮ ঘণ্টার মধ্যে স্থানীয় প্রশাসনকে দিনে ও রাতের জন্য মনিটরিং টিম গঠন করতে বলা হয়েছে যাতে সেখানে আর পাথর লুট হতে না পারে, অথবা প্রতিস্থাপনের পর কেউ যেন সাদা পাথর আবার সরিয়ে নিতে না পারে।
রিটে খনিজসম্পদ বিভাগের সচিব, পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সচিব, পরিবেশ অধিদপ্তর, সিলেটের ডিসি ও এসপি, স্থানীয় প্রশাসন, সিলেটের র্যাব ৯ এবং ওই এলাকার বিজিবি কমান্ডারকে বিবাদী করা হয়েছে।
ভোলাগঞ্জ থেকে সাদা পাথর লুটের ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নিতে দায়ের করা আরেকটি রিটের শুনানির জন্য আগামী ১৭ অগাস্ট দিন ধার্য করেছেন হাইকোর্ট।
সাদা পাথর প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট একটি পর্যটনকেন্দ্র। ২০১৭ সালে পাহাড়ি ঢলে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জ পাথরমহালের ধলাই নদের উৎসমুখে পাঁচ একর জায়গাজুড়ে জমা হয় পাথর। ঢলের তোড়ে সেখানে সর্বশেষ ১৯৯০ সালে একবার পাথর জমা হয়েছিল। সেসব পাথরকে ‘ধলাসোনা’ বলে অভিহিত করা হয়। তবে পাহাড়ি ঢলের পর লুটপাটে সেসব পাথর নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। ২৭ বছরের মাথায় ফের পাথর জমা হওয়ায় উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের পাহারায় সংরক্ষিত হয়। ওই বছর থেকে পুরো এলাকাটি প্রাকৃতিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পায়।
সাদা পাথর এলাকার ওপারে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়ি অঞ্চল লুংলংপুঞ্জি ও শিলংয়ের চেরাপুঞ্জি। সেখানকার ঝরনা থেকে সারা বছর নদের পানি প্রবহমান থাকে। বৃষ্টিবহুল চেরাপুঞ্জির পাদদেশ থেকে বর্ষায় ঢলের পানির সঙ্গে পাহাড় থেকে পাথরখণ্ড এপারে নেমে আসে। ভেসে আসা এই পাথর উত্তোলিত বা আমদানি করা পাথরের চেয়ে দামি। এটির কদরও বেশি। ব্যবহৃত হয় স্থাপত্যকাজে।
সাদা পাথর পর্যটন সৃষ্টি ও তদারকিসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালের মার্চ মাস থেকে মধ্য জুলাই পর্যন্ত মোট ১৩ দফা পাহাড়ি ঢল নেমেছিল। তখন উপজেলা প্রশাসন প্রাথমিকভাবে হিসাব করেছে ঢলের তোড়ে ওপার থেকে পাথরের অন্তত ১৩টি আস্তরণ পড়ে। পাঁচ একর জায়গার ওপরে অন্তত ২০ ফুট পুরু পাথরের স্তর জমে। তখন উপজেলা প্রশাসন লুটপাট ঠেকিয়ে পাথরগুলো সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ২০১৭ সাল থেকে এটি সাদা পাথর পর্যটন এলাকা হিসেবে পরিচিতি পায়।
সাদা পাথর এলাকাটির অবস্থান কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী পশ্চিম ইসলামপুর ইউনিয়নে।
গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২০ সাল থেকে সরকারি নির্দেশনায় বন্ধ থাকা সিলেটের সব কটি পাথর কোয়ারিতে গণলুট শুরু হয়। কয়েক হাজার পাথরশ্রমিক প্রকাশ্যে পাথর উত্তোলন শুরু করেন। বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের পৃষ্ঠপোষকতায় এ লুটপাট চলে বলে অভিযোগ। তখন অন্যান্য পাথর কোয়ারিতে গণলুট চললেও তুলনামূলকভাবে পর্যটনকেন্দ্র সাদাপাথরে লুটপাট কম হয়। তবে গত ২৩ এপ্রিল থেকে সাদাপাথর এলাকায় আবার পাথর লুট শুরু হয়। গত এক সপ্তাহ দেদার লুটপাট চালিয়ে এলাকাটির প্রায় ৮০ শতাংশ পাথর তুলে ফেলা হয়।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জ সীমান্তের শূন্যরেখার কাছে ধলাই নদের উৎসমুখেই সাদাপাথরের অবস্থান। প্রায় ১৫ একর এলাকাজুড়ে এ পর্যটনকেন্দ্র। ছোট-বড় অসংখ্য পাথরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত জলের স্রোতোধারা এ পর্যটনকেন্দ্রের মূল আকর্ষণ। এই সৌন্দর্যের টানে প্রতিদিন দেশ-বিদেশের কয়েক হাজার পর্যটক ভিড় জমান। এখন পাথর লুট হয়ে যাওয়ায় পর্যটকেরা হতাশ।