
সিরাজুল ইসলাম ::
বাংলাদেশের সংবিধান শিশুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও মানবিক বিকাশের নিশ্চয়তা দেয়। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে (UNCRC) স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ আইনগতভাবে বাধ্য—শিশুদের সব ধরনের যৌন ও শারীরিক নির্যাতন থেকে রক্ষা করতে। অথচ বাস্তবতা হলো, দেশের বহু মাদ্রাসায় শিশুরা আজ সবচেয়ে অনিরাপদ।
গত এক দশকে সংবাদমাধ্যম, মানবাধিকার সংগঠন ও আদালতের নথিতে বারবার উঠে এসেছে—কিছু মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীরা যৌন নির্যাতন, বলাৎকার, ধর্ষণ, অমানবিক মারধর ও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। এসব ঘটনায় অভিযুক্তদের বড় একটি অংশ শিক্ষক, হুজুর বা তত্ত্বাবধায়ক—যাদের ওপর শিশুদের আস্থা রাখতে বাধ্য করা হয়।
ভয়াবহ সত্য: অধিকাংশ ঘটনাই প্রকাশ পায় না
শিশু অধিকার কর্মীদের মতে, প্রকাশিত ঘটনাগুলো বাস্তব চিত্রের সামান্য অংশমাত্র। অধিকাংশ ভুক্তভোগী মুখ খুলতে পারে না—
• ধর্মীয় ভয় দেখানো হয়
• “গুনাহ” ও “পাপ”-এর ভাষা ব্যবহার করে চুপ করানো হয়
• পরিবারকে সামাজিক লজ্জা ও হুমকির মুখে পড়তে হয়
• প্রভাবশালী ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মহল অপরাধীদের রক্ষা করে ফলে একটি ভয়ংকর নীরবতার সংস্কৃতি (Culture of Silence) তৈরি হয়েছে, যেখানে শিশু নির্যাতন নিয়মিত হলেও বিচার ব্যতিক্রম।
তদারকির অভাব: মাদ্রাসা ব্যবস্থার কাঠামোগত সংকট
বাংলাদেশে হাজার হাজার মাদ্রাসা কার্যত কার্যকর রাষ্ট্রীয় নজরদারির বাইরে পরিচালিত হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের—
• নিবন্ধন নেই বা ভুয়া
• শিক্ষক নিয়োগে কোনো ব্যাকগ্রাউন্ড চেক নেই
• শিশু সুরক্ষা নীতিমালা নেই
• আবাসিক ছাত্রদের জন্য পর্যবেক্ষণ বা অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা নেই। এই অনিয়ন্ত্রিত পরিবেশই অপরাধীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করেছে। প্রশ্ন হলো—যে প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের ন্যূনতম আইন মানে না, সেখানে শিশুদের পাঠানো কি আদৌ নিরাপদ?
ধর্ম নয়, অপরাধের বিচার চাই
এটি পরিষ্কারভাবে বলা দরকার—ধর্মীয় শিক্ষা নিজেই কোনো সমস্যা নয়। কিন্তু ধর্মকে ঢাল বানিয়ে যদি শিশুদের ওপর যৌন ও শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়, তাহলে সেটি আর ধর্মীয় বিষয় থাকে না—তা হয়ে ওঠে গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ।
যারা বলে “ইমেজ নষ্ট হবে” বা “ধর্ম আক্রান্ত হবে”—তারা মূলত অপরাধীদের পক্ষ নিচ্ছে। শিশু নির্যাতন আড়াল করা ধর্মরক্ষা নয়; বরং এটি ধর্মের সবচেয়ে বড় অপমান।
মাদ্রাসা ব্যান: কঠোর হলেও অনিবার্য দাবি
যেসব মাদ্রাসায় বারবার নির্যাতনের অভিযোগ প্রমাণিত হচ্ছে, যেখানে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, সেখানে সংস্কারের নামে সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই।
সেসব প্রতিষ্ঠানকে অবিলম্বে বন্ধ (Ban) করতে হবে।
একটি সভ্য রাষ্ট্রে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিশুদের জন্য ভয়ংকর হলে তার অস্তিত্বের অধিকার থাকে না—সে প্রতিষ্ঠান ধর্মীয় হোক বা না হোক।
এখনই যা করতে হবে
১. সব মাদ্রাসাকে বাধ্যতামূলক নিবন্ধন ও নিয়মিত রাষ্ট্রীয় অডিট
২. আবাসিক মাদ্রাসায় ২৪/৭ মনিটরিং ও স্বাধীন পরিদর্শন
৩. শিশু সুরক্ষা আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ
৪. নির্যাতনের অভিযোগে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল
৫. অপরাধ প্রমাণিত হলে প্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে বন্ধ
৬. ভুক্তভোগী শিশুদের মানসিক ও আইনি সহায়তা
৭. অভিভাবক ও সমাজে ব্যাপক জনসচেতনতা
শেষ কথা: এটি আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি ব্যবস্থাগত অপরাধ।
রাষ্ট্র যদি এখনো কঠোর না হয়, তবে আমরা প্রত্যেকে এই নির্যাতনের নৈতিক দায় বহন করব।
শিশুদের জীবন, শরীর ও মানসিক সুস্থতার চেয়ে বড় কিছু নেই—না ধর্ম, না প্রতিষ্ঠান, না রাজনীতি।
নীরবতা ভাঙতেই হবে। অপরাধের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়তেই হবে।
লেখক- সমাজকর্মী।