গণতন্ত্রে মতভিন্নতা থাকবে, তবে তা যেন শত্রুতায় রূপ না নেয়: তারেক রহমান

ডেইলি বাংলার আলো ::
প্রকাশিত September 11, 2026
গণতন্ত্রে মতভিন্নতা থাকবে, তবে তা যেন শত্রুতায় রূপ না নেয়: তারেক রহমান

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, গণতন্ত্রে মতভিন্নতা ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে, তবে তা যেন কোনোভাবেই শত্রুতায় রূপ না নেয়।’

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী দিনে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী একথা বলেন।

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট ও খেলাপি ঋণের মতো জাতীয় সমস্যাগুলোকে বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলের ‘উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া দায়’ হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তবে এসব সমস্যাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার না করে দ্রুত জনজীবনে স্বস্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে তার সরকার নিরলসভাবে কাজ করছে।

একইসঙ্গে রাজপথে আন্দোলন-লংমার্চের নামে পরিস্থিতি ঘোলাটে না করে দেশ পুনর্গঠনে বিরোধী দলকে দায়িত্বশীল ও সহযোগিতাপূর্ণ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

সংসদকে জাতীয় স্বার্থের সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু বানানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘এই সংসদের প্রতি দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের প্রত্যাশা অনেক। আমরা যদি মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারি, তবে আমাদের জনগণের আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।
সেই তাগিদ থেকেই দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিন থেকেই আমরা কাজ করছি।’

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট: মূল কারণ ও উত্তরণের পথ
দেশে বিদ্যমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই সমস্যা হঠাৎ তৈরি হয়নি।
পতিত ফ্যাসিবাদী সরকার দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস উত্তোলনের কোনো কার্যকর উদ্যোগ না নিয়ে দেশকে সম্পূর্ণ আমদানি নির্ভর করে ফেলেছিল। আমাদের গ্যাস আমদানির মূল উৎস ছিল মধ্যপ্রাচ্য। কিন্তু বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ১০-১২ দিনের মাথায় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়, যা জ্বালানি সরবরাহে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। এর ওপর বাংলাদেশের দুটি এলএনজি টার্মিনালের একটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সংকট আরও গভীর হয়।

সংকটকালে বিরোধী দলের ভূমিকার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘আমরা এই দুর্যোগে বিরোধী দলের সহযোগিতা আশা করেছিলাম। কিন্তু সহযোগিতা দূরে থাক, বিরোধী দলের বন্ধুরা বিশাল গাড়ির বহর নিয়ে ‘লং মার্চ’ করেছেন এবং জনগণকে উত্তেজিত করার অপচেষ্টা চালিয়েছেন। গাড়ির বহর নিয়ে লং মার্চ করে যদি গ্যাস-বিদ্যুতের সমাধান হতো, তবে আমরাও তাতে অংশ নিতাম।’

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী মনে করিয়ে দেন, ২০২২ সালের আগস্টে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় তৎকালীন সরকার বিদ্যুতের সংকট সামাল দিতে অফিসের সময়সূচি পরিবর্তন, ব্যাংকের লেনদেন পুনর্নির্ধারণ এবং সপ্তাহের স্কুল ছুটি দু’দিন করেছিল। শত শত কোটি টাকা খরচ করে কুইক রেন্টাল বসিয়েও তারা স্থায়ী সমাধান করতে পারেনি।

বিদ্যুৎ খাতে স্থায়ী সমাধানের ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, ‘সরকার দেশকে আমদানি নির্ভরতা থেকে বের করে আনার পরিকল্পনা শুরু করেছে। শিগগিরই সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যাপক পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আমরা আর শুধু গ্রাহক থাকব না, সৌর বিদ্যুতের উৎপাদক হব ইনশাআল্লাহ।’

অর্থনীতি ও ঋণখেলাপির অভিশাপ থেকে মুক্তির উদ্যোগ: বিগত সরকারের আমলের দুর্নীতি ও ঋণখেলাপির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ২০২৪ সালে বিদায়ী ফ্যাসিস্ট সরকার খেলাপি ঋণের পরিমাণ মাত্র ১১ শতাংশ দেখিয়েছিল। তবে ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ফরেনসিক অডিটে বেরিয়ে আসে প্রকৃত খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩৫.৫ শতাংশ।

বর্তমান সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের ফলে খেলাপি ঋণের এই হার ইতোমধ্যেই কমে ৩২.৬ শতাংশে নেমে এসেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যেমন ২০০১ সালে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কলঙ্ক থেকে বিএনপি দেশকে মুক্ত করেছিল, তেমনি ২০২৬ সালে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ঋণখেলাপির কলঙ্ক থেকেও বাংলাদেশকে মুক্ত করা হবে।’

তিনি আরও জানান, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া বৈদেশিক ঋণের বোঝা সত্ত্বেও বর্তমান সরকার গত পাঁচ মাসে রেকর্ড ২০৪ কোটি ৭৬ লাখ মার্কিন ডলার ঋণের আসল ও সুদ বাবদ পরিশোধ করেছে।

বিএনপির ঐতিহাসিক ভূমিকা ও সফলতার স্মৃতিচারণ: দেশ ও জাতির সংকটকালে বিএনপির অতীত অবদানের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ৭০-এর দশকের শেষে তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদ ঘুচিয়ে দেশকে রপ্তানিমুখী অর্থনীতিতে রূপান্তর করেছিলেন। বৈদেশিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি দেশের অর্থনীতিতে বিপ্লব এনেছিলেন।

পরবর্তীকালে ১৯৯১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার নারী শিক্ষায় অভূতপূর্ব বিপ্লব ঘটায় এবং প্রায় দুই কোটি মানুষকে দারিদ্র্যসীমা থেকে মুক্ত করে। ২০০১ সালেও জনরায়ে নির্বাচিত হয়ে বিএনপি সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল।

রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও ‘বাক শালীনতার’ আহ্বান:
বর্তমান দেশে অবাধ গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও বাকস্বাধীনতা বিরাজ করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী সবাইকে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শালীনতা বজায় রাখার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, ‘বাকস্বাধীনতা যেন ‘বাক শালীনতার’ সীমা ছাড়িয়ে না যায়। গালাগালি যেন আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত না হয়। পারিবারিক পরিবেশে যেসব কথা বলতে আমরা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি না, জনপরিসরেও তা বলা উচিত নয়। আসুন, আমরা সবাই মিলে গালাগালির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হই।’

ঐক্যবদ্ধভাবে রাষ্ট্র মেরামতের বার্তা:
জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের রক্ত প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ন্যায়পরায়ণতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই শহীদদের রক্তের ঋণ পরিশোধ করতে হবে। সরকারি ও বিরোধী দল মিলে আমাদের লক্ষ্য একটিই-‘সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’।’

পরিশেষে গণতন্ত্রকামী সব শক্তির প্রতি সতর্কবার্তা দিয়ে তিনি বলেন,‘আমাদের নিজেদের মধ্যে বিভেদ বা বিরোধ শেষ পর্যন্ত বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট অপশক্তির পুনরুত্থানের পথ সুগম করবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।